in হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম (রহঃ)

তাঁর মতো ভালো মানুষ, নির্ভেজাল মানুষ এ সময়ে আর পাওয়া যাবে না।

শাইখুল হাদীছ হযরতুল আল্লাম আযীযুল হক সাহেব (দাঃ বাঃ)।

কুতুবুল আলম মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ) এর ইন্তিকালের পর অশীতিপর বৃদ্ধ তাঁর প্রাণপ্রিয় উস্তাদ হযরত শাইখুল হাদীছ আল্লামা আযীযুল হক ঢাকা থেকে সুদূর চরমোনাই গিয়ে প্রিয় ছাত্রের সাথে শেষবারের মতো মোলাকাত করেন। তিনি পীর সাহেব (রহঃ) সম্পর্কে যে বক্তব্য পেশ করেছেন তার মাধ্যমেই হযরত পীর সাহেবের উচ্চ মাকাম ও বুযুর্গী সম্পর্কে অনুমান করা যায়। হযরত শাইখুল হাদীছ সাহেব বলেনÑ হাদীছ শরীফে এসেছে, যে ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ্র যত বেশি রহমাত এবং ভালবাসা থাকে, তার প্রতি মানুষেরও তত বেশি ভালবাসা থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ্র নিকট যত প্রিয় হয়, মানুষের মাঝেও সে তত প্রিয় ব্যক্তি হয়। যার অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি যত বেশি আকর্ষণ ও টান থাকে, মানুষের অন্তরেও তার প্রতি ততবেশি আকর্ষণ থাকে। এর বাস্তব উদাহরণ পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ)। তাঁর জানাযায় এত লক্ষ লক্ষ লোকের উপস্থিতি প্রমাণ করে তার অন্তরে আল্লাহ্র প্রতি কিরূপ আকর্ষণ ছিল। তিনি আল্লাহ্ তায়ালার কাছে কি পরিমাণ মাক্ববূল আর প্রিয় ছিলেন তা বোঝা যেত তাঁর মাহফিল সমূহে।
পীর সাহেব আমার ছাত্র ছিলেন, শুধু ছাত্র নয়, অত্যন্ত প্রিয় ও খুব মহব্বতের ছাত্র। আমি যখন লালবাগ মাদ্রাসায় হাদীছ শরীফ পড়াই তখন তিনি আমার কাছে পড়েছেন। ছাত্র যামানা থেকেই আমি তাকে খুব মহব্বত করতাম। তিনি ছিলেন খুব ভদ্র ও আমলদার ছাত্র। আমার আদরের এ ছাত্রটি আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে উচ্চ মাকাম দান করুন।
আমি এমনিতেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে বেশি দূর সফর করতে পারি না। কাছাকাছি জায়গাতে হুইল চেয়ারে কিংবা গাড়িতে করে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু আমি যখন আমার এ প্রাণপ্রিয় ছাত্রের ইন্তিকালের সংবাদ শুনলাম তখনই মনস্থ করলামÑ আমি যাব। আমার ছাত্রের জানাজায় আমি শরীক হব। কষ্ট করে হলেও আমার এ প্রিয় ছাত্রের সাথে শেষ বারের মত মিলিত হবো।
একনজর তাঁর চেহারাটুকু দেখতে আমার মন বার বার আন্চান্ করছিল। অবশেষে এক কাফেলা নিয়ে আমি রওয়ানা হলাম বরিশালের প্রান্ত সীমা চরমোনাইর উদ্দেশ্যে। গাড়িতে ওঠানামা, চলাফেরা যত সহজ লঞ্চে তত সহজ নয়। সদরঘাটের হাজারো মানুষের ভিড়ে চলাফেরা করতে এবং লঞ্চের সফরে আমার যে কোন কষ্ট হয়নি তা নয়; কষ্ট হয়েছে, তবে আমার কাছে এসব কষ্ট ম্লান হয়ে গেছে আমার প্রিয় এ ছাত্রের মুখখানা দেখে।
তিনি অসুস্থ, এ খবর দীর্ঘদিন থেকেই পাচ্ছিলাম। তাঁর বিষয়ে সর্বদা খোঁজখবর নিতাম। বছরখানেক আগে একবার পত্রিকার বড় শিরোনামে দেখলামÑ চরমোনাইর পীর অসুস্থ। খবরটি দেখে আমি তাড়াতাড়ি আমার খাদেমদেরকে বললাম, গাড়ী বের কর। আমি পীর সাহেবকে দেখতে যাব। সেদিন আমার ছেলে মাওলানা মাহবুব আমাকে নিয়ে গেছে বারডেম হাসপাতালে। প্রথমে গেলাম মনে হয় ষষ্ঠ তলায়। সেখানে গিয়ে শুনলাম তিনি এখন দ্বিতীয় তলায় আছেন। দ্বিতীয় তলায় গিয়ে দেখলাম তার ডায়ালিসিস চলছে। একটি বিছানায় শোয়া। মেশিনে ডায়ালিসিস চলছে। আমাকে পেয়ে তিনি এবং তাকে পেয়ে আমি দু’জনে অত্যন্ত আনন্দিত হলাম। অনেক কথাই সেদিন হলো।
গত মাস ছয়েক আগে যখন আমি কওমী মাদ্রাসার সনদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবীতে মুক্তাঙ্গনে লাগাতার অবস্থান করছি, তখন আমার এ প্রিয় ছাত্র আমাকে দেখতে, আমার পাশে দাঁড়াতে সেখানে ছুটে গেছেন। আমার আন্দোলনের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। তাঁকে পেয়ে আমার মনে হয়েছে আমার শক্তি যেন আল্লাহ্ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি সেখানে বলেছি আমার ডান হাত এসে গেছে, এখন আন্দোলন চলবে অবিরাম। সেদিন সাক্ষাতেই আমার মনে হচ্ছিল তিনি যেন ক্রমে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। চেহারা নরম হয়ে আসছে। আমি বারংবার তাঁর দীর্ঘ হায়াত কামনা করেছি।
আল্লাহ্ তায়ালার ইচ্ছাই চূড়ান্ত। তিনি চেয়েছেন তাঁর এ মাকবূল বান্দা তাঁর কাছে চলে আসুক। তা-ই হয়েছে, তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাকে নিজের কাছে নিয়ে গেছেন। আমি তাঁর জন্য দোয়া করি এবং সর্বদাই করব। তাঁর মতো ভালো মানুষ, নির্ভেজাল মানুষ এ সময়ে আর পাওয়া যাবে না।
তিনি চলে যাওয়াতে অনেকে অনেক কিছু হারিয়েছে। কেউ হারিয়েছে পীর-মুর্শিদ, কেউবা নেতা। আর আমি হারিয়েছি আমার অতি আপন ও মহব্বতের এক ছাত্র। তাঁর ব্যথা কোনদিন দূর হওয়ার নয়। তাঁর ছেলেরা সবাই আমার সাথে সাক্ষাত করেছে। সবাই মাশাআল্লাহ্ সূরতে সীরাতে বাপের মতোই হয়েছে। শুনেছি তাঁর এক ছেলে এখন তাঁর স্থলাভিষিক্ত। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে সঠিক যোগ্যতা দান করুন এবং পিতার মহান দায়িত্ব আঞ্জাম দেয়ার তাওফীক দান করুন। আল্লাহ্ তায়ালা হযরত পীর সাহেবকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। (আমীন)