in হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম (রহঃ)

শীয়া ও বাহাই ফিতনার বিরোধিতা

ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুয়াবিয়া (রাঃ) এর মধ্যে যখন যুদ্ধ হয়, তখন হযরত আলী (রাঃ) এর অনুসারীদের একটি দল তাকে নিয়ে অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি করে। এরাই শীয়ায়ে আলী তথা শীয়া মুসলমান নামে পরিচিতি লাভ করে। স্বয়ং হযরত আলী (রাঃ) তাদের এরূপ বাড়াবাড়ির জন্য কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারী করেন এবং তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ দেন।

পরবর্তীকালে শীয়াদের মধ্যে অনেকগুলো উপদল সৃষ্টি হয়। এসব উপদলের কারো আক্বীদা হলো, হযরত আলীকে আল্লাহ্ তায়ালা নবুওয়াত দান করেছেন। কিন্তু হযরত জিব্রাঈল (আঃ) ভুলক্রমে হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট ওহী নিয়ে যান। শীয়াদের উপদলের মধ্যে ইছনা আশারিয়া বার ইমামপন্থী দলটিই সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী। বর্তমান বিশ্বে ইছনা আশারিয়া ছাড়া অন্যান্য উপদলের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বর্তমান বিশ্বে ইরানই একমাত্র দেশ যেখানে ইছনা আশারিয়া শীয়ারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। ইরানের জনসংখ্যার ৯৫% জনই শীয়া। ইরান ছাড়া ইরাক ও লেবাননে শীয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ইছনা আশারিয়া তথা বার ইমামপন্থী শীয়াদের ভ্রান্ত আক্বীদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইন্তিকালের পরে হযরত আলী (রাঃ) খেলাফতের হকদার ছিলেন, কিন্তু হযরত আবূ বকর, হযরত ওমর ও হযরত ওসমান (রাঃ) জোরপূর্বক ও অন্যায়ভাবে তাঁর খেলাফতের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছেন। এ ব্যপারে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস হলো, ইসলামের প্রথম খলীফা হলেন হযরত আলী (রাঃ), দ্বিতীয় খলীফা হযরত হোসাইন (রাঃ), তৃতীয় খলীফা হযরত জয়নুল আবেদীন (রহঃ), চতুর্থ খলীফা হযরত ইমাম বাকের (রহঃ), পঞ্চম খলীফা ইমাম মূসা কাযেম (রহঃ)। এভাবে তাদের বারজন খলীফা তথা ইমাম রয়েছে। বারতম ইমাম আসল কুরআন নিয়ে অদৃশ্য হয়েছেন। কিয়ামতের পূর্বে তিনি আসল কুরআন জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন।
তাদের মতে, বর্তমানে আমরা যে কুরআন দেখতে পাই তা আসল কুরআন নয় বরং এ কুরআন হলো প্রথম তিন খলীফা হযরত আবূ বকর, হযরত ওমর ও হযরত ওসমান (রাঃ) এর মনগড়া রচনা।
শীয়াদের মতে, হযরত আলী, ফাতিমা, হাসান হোসাইন (রাঃ) সহ মাত্র ৪/৫ জন সাহাবী জান্নাতী। অবশিষ্ট সকল সাহাবী কাফির এবং জাহান্নামী।
শীয়ারা আরো বিশ্বাস করে যে, হযরত আবূ বকর, হযরত ওমর, হযরত ওসমান (রাঃ) এবং আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) কাফির। তাদেরকে গালি দেয়া ছওয়াবের কাজ। তাদের বারতম ইমাম কিয়ামতের পূর্বে আত্মপ্রকাশ করে এসকল সাহাবীকে কবর থেকে তুলে তাদের অপরাধের শাস্তি স্বরূপ দোররা মারবে।
বার ইমামপন্থী শীয়াদের বিশ্বাস, মিথ্যা কথা বলা জায়েয এবং নিকাহে মুতা তথা সাময়িক বিবাহ জায়েয। এরা নামাযের আযানে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামের সাথে আলী (রাঃ) এর নাম উচ্চারণ করে থাকে।
শীয়াদের এসব আক্বীদা ছাড়াও আরো অসংখ্য ভ্রান্ত আক্বীদা রয়েছে। এসব ভ্রান্ত আকীদার কারণে সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবে’ তাবেয়ীন, আইম্মায়ে মুজতাহিদীন, মুহাদ্দিছীন মুফাস্সিরীনসহ সর্বযুগের অলী, দরবেশ, পীর, বুযুর্গ এবং হক্কানী ওলামায়ে কেরামের মতে- শীয়ারা অমুসলিম, গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট। যে ব্যক্তি এ জাতীয় ভ্রান্ত আকীদা পোষণ করবে, সে আর মুসলমান থাকবে না।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের সাধারণ মুসলমানতো বটেই, অনেক আলেম-ওলামা পর্যন্ত শীয়াদের এসব ভ্রান্ত ধর্মবিশ্বাস ও আক্বীদা সম্পর্কে অবহিত নয়। ফলে তারা শীয়াদেরকে মুসলমান মনে করে। তাদের ধারণা, শীয়ারা মুসলমানদেরই একটি সম্প্রদায়। যেমন- মুসলমানদের মধ্যে হানাফী, শাফেয়ী, মালেকী, হাম্বলী প্রভৃতি নামে মাযহাবগত একাধিক সম্প্রদায় রয়েছে। অনেক আলেম এবং ইসলামী রাজনীতিবিদ এদের আক্বীদা সম্পর্কে না জানার কারণে ইরানকে আদর্শ মুসলিম দেশ, শীয়া হুকুমতকে আদর্শ ইসলামী হুকুমত এবং ইমাম খোমেনীর বিপ্লবকে ইসলামী বিপ্লব বলে অভিহিত করে থাকেন। অথচ প্রকৃতপক্ষে এগুলো তাদের অজ্ঞতারই পরিচায়ক।
বাহাই ফেরকাও শীয়াদের থেকে সৃষ্ট, শীয়া মতবাদের অনুসারী বাহাউল্লাহ নামক জনৈক ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবী করে। যারা তাকে নবী বলে স্বীকার করে তার অনুসারী হয় তাদেরকে বাহাই বলা হয়। বাহাইদের প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র হলো ইসরাঈলে। সেখান থেকে সমগ্র বিশ্বে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ইহুদী ও খ্রিস্টানদের সাহায্য ও সমর্থনে বাহাইরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেও বাহাইদের অফিস, স্কুল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এরা মুসলমানদের ন্যায় নামায রোযা করে। মুসলমান পরিচয়ে এরা মুসলমানদের মাঝে বাহাই ধর্ম প্রচার করে সরলপ্রাণ মুসলমানদেরকে ঈমানহারা, মুরতাদ ও কাফির বানাচ্ছে।
হযরত পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ) আজীবন ভ্রান্ত শীয়া মতবাদের বিরোধিতা করেছেন। উল্লেখ্য, শীয়া তোষণনীতির কারণে হযরত হাফেজ্জী হুযূর (রহঃ) এর খেলাফত আন্দোলন এবং তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ওলামায়ে কেরামের ঐক্যেও ফাটল সৃষ্টি হয়। ১৯৮১ এর নির্বাচন পরবর্তীকালে হযরত হাফেজ্জী হুযূর (রহঃ) ইরান ও ইরাক থেকে দাওয়াত পান। তখন ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলছিলো। হযরত হাফেজ্জী হযূর (রহঃ) দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধ বিরতির জন্য অনুরোধ করার উদ্দেশ্যে মূলতঃ ইরান ও ইরাক সফর করেন। কিন্তু হাফেজ্জী হুযূরের সফরসঙ্গীদের কেউ কেউ এ সফরকে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। ইরান থেকে প্রাপ্ত হাদিয়া ও উপঢৌকনসমূহ ভাগ-বাটোয়ারা করে তারা বাড়ি-গাড়ী ও বিলাসিতায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারা দেশে এসে শীয়া তোষণ ও তাদের প্রশাংসায় পঞ্চমুখ হয়ে পড়ে। উপরন্তু, কিছু লোকের শীয়া তোষণনীতির কারণে হাফেজ্জী হুযূর (রহঃ) ও তাঁর খেলাফত আন্দোলনের সমর্থক জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম এবং আরো কতিপয় হকপন্থী আলেম খেলাফত আন্দোলন থেকে তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করে নেন। পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ) এ সময় শীয়া তোষণকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন এবং তাদের শীয়াপ্রীতির তীব্র বিরোধিতা করেন।
১৯৮৮ সালে ইরানী বিমানে মার্কিন হামলায় অসংখ্য লোক মারা যায়। বাংলাদেশেও এর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। এসময় শীয়া তোষণকারী কপিতয় আলেম ও একটি নামধারী ইসলামী সংগঠন প্রতিবাদ, মিছিল-মিটিং করে এর ছবি ভিডিও করে ইরানী দু’তাবাস ও ইরানী কালচারাল সেন্টারে প্রেরণ করে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা লুফে নেয়। তারা শীয়া-সুন্নী ঐক্যের পাঁয়তারা করে। এসময় হকপন্থী ওলামায়ে কেরামের মধ্যে বিভাজন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফলশ্রুতিতে অনেকে সন্দেহের মধ্যে পড়ে যায়। বহু আলেমের মধ্যে এ নিয়ে মতভেদ সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে হযরত পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ), ফরিদাবাদ মাদ্রাসার মুহতামিম আল্লামা ফজলুর রহমান (রহঃ), হযরত মাওলানা আবদুল গাফফার (রহঃ), অধ্যাপক মাওলানা আখতার ফারুক (রহঃ)সহ দেশের বহু শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় এক বৈঠকে মিলিত হন। তাঁরা ঐ বৈঠকে ইরানের কথিত ইসলামী বিপ্লব ও তাদের আক্বীদা-বিশ্বাস পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেন যে, শীয়ারা মুসলমান নয়, তাদের সাথে আমাদের কোন ঐক্য বা সম্প্রীতি হতে পারে না। এ বৈঠকে হযরত পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ)ই সর্বপ্রথম স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমান ইরানী শীয়াদের আক্বীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে আমার সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। আপনারা যা বললেন, যদি তা সত্য হয়, তাহলে অবশ্যই এদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না। এর অল্প কয়েকদিন পর মর্দে মু’মিন হযরত পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ) ঘোষণা করেন, শীয়াপ্রীতিতে অভিভূত কোন দল কিংবা রাজনীতির সাথে আমি নেই।(মাসিক কাবার পথে ঃ জানুয়ারী ২০০৭)
সমসাময়িক কালের একজন প্রখ্যাত আলেম ইরানী বিপ্লবকে ইসলামী বিপ্লব এবং শীয়া হুকুমতের প্রশংসা করে শীয়া-সুন্নী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করে একখানা কিতাব রচনা করেন। এ বই হযরত পীর সাহেবের দৃষ্টিগোচর হলে তিনি লেখককে ডেকে এনে শীয়াদের বিরোধিতা করে ঈমানী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং আকাবিরদের পদাংক অনুসরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উল্লেখ্য, মুজাদ্দিদে আলফেসানী (রহঃ), শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ), শাহ আবদুল আযীয দেহলভী (রহঃ), সৈয়দ আহ্মাদ শহীদ (রহঃ), শাহ ইসমাঈল শহীদ দেহলভী (রহঃ), হযরত কাসেম নানুতবী (রহঃ), শাইখুল হিন্দ আল্লামা মাহমূদুল হাসান (রহঃ), আল্লামা মঞ্জুর নোমানী (রহঃ), সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ), আল্লামা থানভী (রহঃ) সহ উম্মাতের পূর্ববর্তী সকল আকাবির ও ইমামগণ শীয়াদেরকে অমুসলিম ও পথভ্রষ্ট আখ্যায়িত করে তাদের ভ্রান্ত আক্বীদা ও বিশ্বাসের ওপর অসংখ্য কিতাব রচনা করেছেন।