in হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম (রহঃ)

জন্ম ও বংশ পরিচিতি

আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বান্দাদের প্রতি স্নেহ ও মায়া-মমতা এত অধিক যে, তিনি মহানবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মাধ্যমে নবুওয়াত ও রিসালাতের দরওয়াজা বন্ধ করে দিলেও বান্দাদের হেদায়াতের লক্ষ্যে যুগে যুগে নায়েবে রসূল তথা আউলিয়ায়ে কেরামকে দুনিয়ায় প্রেরণ করেন। আল্লাহ্ তায়ালার নৈকট্যপ্রাপ্ত এবং সন্তুষ্টিপ্রাপ্ত এ সকল আউলিয়ায়ে কেরাম মানব জাতির হেদায়াতের লক্ষ্যে নিজেদের জীবনকে তিলে তিলে বিলিয়ে দেন। তাঁরা মানুষকে শয়তানী ও গোমরাহীর বেড়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার আহবান জানান এবং মানবজাতিকে শয়তান ও তাগুতের আনুগত্য পরিহার করে আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনুগত্য করতে উদ্বুদ্ধ করেন। তাঁরা মানুষকে দ্বীন ইসলামের দাওয়াত দেন, মানব জাতিকে আল্লাহর মহাপবিত্র কালাম শিক্ষা দেন, পবিত্র কুরআনের তা’লীম প্রদান করেন, হিকমত শিক্ষা দেন, আল্লাহর কালাম থেকে শরয়ী আহকাম বের করে মানব জাতির কাছে উপস্থাপন করেন, মানব জাতির এসলাহ ও তায্কিয়াহ্ করেন, আল্লাহর যমীন থেকে শিরক, বিদ্য়াত, কুফর, তাগুত ও খোদাদ্রোহীতার মূলোৎপাটন করে মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ করেন, শাহাদাত বরণ করেন। পবিত্র আত্মার অধিকারী এ সকল মহামানব আল্লাহর নৈকট্য প্রাপ্ত ফেরেশতাদের চেয়েও অধিক মর্যাদাশালী। আল্লাহর রেজামন্দী প্রাপ্ত এ মহান কাফেলার এক মহাসম্মানিত সদস্য ছিলেন কুতুবুল আলম, মুজাদ্দেদে যামান, রাহবারে মিল্লাত, শাইখুল মাশায়েখ, মুজাহিদে আযম, মুর্শিদে মুকাম্মিল, আমীরুল মুজাহিদীন হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম (রহঃ)।

এ ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ছিলেন তদীয় যামানার একজন রব্বানী আলিম, সমসাময়িক কালের একজন শ্রেষ্ঠতম কামেল বুযুর্গ, অলী ও দরবেশ, একজন সফল শিক্ষাবিদ, মুবাল্লিগে দ্বীন, ইলমে তাসাওউফ, মা’রিফাত ও তরীকার একজন শাইখ ও মুর্শিদ, দা’য়ী ইলাল্লাহ, আধ্যাত্মিকতার উচ্চ সোপানে আরোহনকারী একজন সূফী-সাধক, আরেফে রব্বানী, হক্কানী পীরে মোকাম্মেল, এক মহান বিপ্লবী মুজাহিদ, উম্মাতের হাদী ও রাহবার।

মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম, পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ) এর পূর্ব পুরুষদের সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তা হল- বাগদাদে আব্বাসীয় রাজত্বকালের শেষ দিকে সৈয়দ আলী আকবার সাহেব ও সৈয়দ আলী আসগর সাহেব নামক দুই ভাই বাগদাদ হতে বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আগমন করেন। এর মধ্যে সৈয়দ আলী আকবার সাহেব বরিশাল শহরের নিকটস্থ কীর্তনখোলা নদীর পূর্ব পাড়ে অবস্থিত পশুরীকাঠী গ্রামে এবং সৈয়দ আলী আসগর সাহেব বরিশাল শহরের পশ্চিমে লাকুটিয়া গ্রামে ফকীর দরবেশরুপে বসবাস করতে শুরু করেন। পরবর্তী কালে তারা স্থানীয় জনগণের ভক্তি ও শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত হন এবং স্থানীয় সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিবাহ করে এ দেশের স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান।

সৈয়দ আলী আকবার সাহেবের এক পুত্র ছিলেন সৈয়দ গোলাম আলী সাহেব। তাঁর পুত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন সৈয়দ ওমর আলী সাহেব। তাঁর পুত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন সৈয়দ আমজাদ আলী সাহেব (রহঃ)। তিনি একজন বিশিষ্ট ওলী ছিলেন। সৈয়দ আমজাদ আলী সাহেব (রহঃ) এর ঔরসে জন্মগ্রহণ করেন হাদীয়ে জামান, কুতুবুল আলম, পীরে মোকাম্মেল হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ এছহাক (রহঃ)। এ মহান দরবেশই চরমোনাই দরবারের মূল প্রতিষ্ঠাতা। সৈয়দ মুহাম্মাদ এছহাক (রহঃ) উজানীর শাইখুল কোররা ও শাইখুল মাশায়েখ হযরত ক্বারী ইব্রাহীম সাহেব (রহঃ) এর নিকট পবিত্র কুরআন শিক্ষা এবং তদীয় মামা ও শশুর হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ আবদুল জাব্বার সাহেব (রহঃ) এর নিকট প্রাথমিক দ্বীনী শিক্ষা সমাপন করে ভোলা দারুল হাদীছ আলিয়া মাদ্রাসা হতে জামায়াতে উলা কৃতিত্বের সাথে সমাপন করেন। অতঃপর উজানীর ক্বারী সাহেব (রহঃ) এর হাতে বাইয়াত হয়ে মুজাহাদা-রিয়াযতের মাধ্যমে ইলমে মারেফাতে পূর্ণতা প্রাপ্ত হন এবং খেলাফত ও ইজাযত প্রাপ্ত হন। এরপর তিনি তাঁর গোটা জীবনই তরীকার খেদমত, তাবলীগ-দাওয়াত ও মানব জাতির হেদায়াতের লক্ষ্যে অতিবাহিত করেন। তাঁর মাধ্যমে বাংলার ঘরে ঘরে আজ চিশতিয়া ছাবেরিয়া তরীকার আলোক রশ্মি পৌঁছে গিয়েছে। তাঁর দাওয়াত ও সুহ্বাতের ফলে বাংলার হাজার হাজার মানুষ হেদায়াতের দিশা পেয়েছে। তিনি ইসলামের প্রচার ও কল্যাণার্থে চরমোনাই আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ২৭ খানা কিতাব রচনা করেছেন, তাবলীগ ও তরীকার কাজ করার জন্য মুজাহিদ কমিটি নামক একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। জিহাদ ও রাজনৈতিক জীবনেও তিনি পিছপা ছিলেন না। সমাজ ও রাষ্ট্র হতে অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড দূর করে সর্বক্ষেত্রে ইসলামী হুকুমত কায়েমের লক্ষ্যে তিনি ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত বাংলাদেশ নেযামে ইসলাম পার্টির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এ মহান ওলী ও বুযুর্গের ঔরসেই জন্মগ্রহণ করেছেন আমাদের আলোচিত ব্যক্তিত্ব হযরত মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ ফজলুল করীম, পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ)।

পীর সাহেব চরমোনাই (রহঃ) এর পিতৃকুলের মধ্যে পিতা, পিতামহ যেমন ছিলেন বিখ্যাত অলী ও দরবেশ, তেমনি তাঁর মাতৃকুলের মধ্যেও মামা এবং মাতামহও (নানা) ছিলেন কামেল বুযুর্গ। তাঁর নানা ছিলেন মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মাদ আবদুল জাব্বার ওরফে আহছানুল্লাহ্ সাহেব (রহঃ)। তার নামানুসারেই চরমোনাইয়ের নাম রাখা হয় আহছানাবাদ। মাওলানা আবদুল জাব্বার সাহেব (রহঃ) দেওবন্দ মাদ্রাসা হতে দাওরায়ে হাদীছ সমাপ্তকারী তৎকালীন যুগের বিখ্যাত আলিম ছিলেন। তিনিই উজানীর ক্বারী ইব্রাহীম সাহেব (রহঃ) এর সর্বপ্রথম খলীফা ছিলেন। তাঁর তাওয়াক্কুল এত ছিল যে, তিনি ঘরে কোন খাদ্য-দ্রব্য জমা রাখতেন না, থাকলে তা সাথে সাথে ফকীর-মিসকীনদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়ে ঘর খালি করে রাখতেন। তিনি একজন উচ্চ দরজার অলী ও দরবেশ ছিলেন। তাঁর অসংখ্য কারামতের মধ্যে একটি কারামতই ছিল যে, তিনি কখনো মশারী খাটিয়ে ঘুমাতেন না। তাঁর গায়ে কখনও মশা বসত না (সুবহানাল্লাহ্)।

এ আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হুযূরের পিতৃকুল এবং মাতৃকুল উভয়ই ছিল বুযুর্গ খান্দান। তাঁর ধমনীতে প্রবাহিত ছিল বুযুর্গ ও মুজাহিদের রক্ত। তাঁর উভয় খান্দানই ছিল সৈয়দ বংশীয়। এ সম্পর্কে হযরত পীর সাহেব (রহঃ) বলেন “কাগজ পত্রে আমাদের বংশের নাম সৈয়দ বংশ লেখা হয়। কিন্তু কোন সনদ না থাকার কারণে আমরা আওলাদে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাবী করি না। তবে আওলাদে রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হওয়ার সন্দেহের কারণে আমরা ফিতরা-যাকাত গ্রহণ করি না।” এ ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ ১৯৩৫ সাল মোতাবেক ১৩৫৪ হিজরীতে বরিশাল জেলার সদর উপজেলার অন্তর্গত চরমোনাই গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন।

Related Posts